গবেষণা জগতে সাইটেশন মানেই প্রভাব, গ্রহণযোগ্যতা আর আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির মাপকাঠি। কোনো গবেষকের কাজ যত বেশি অন্যরা ব্যবহার করবেন, ততই বাড়বে তার সাইটেশন সংখ্যা। কিন্তু সেই পরিচিত সূত্রকেই এখন প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছেন ইন্দোনেশীয় গবেষক Yoesoep Edhie Rachmad। কারণ গুগল স্কলার প্রোফাইলে তার সাইটেশন সংখ্যা ৫০ লাখেরও বেশি—যা শুনে বিস্মিত না হয়ে উপায় নেই।
একাডেমিক মহলে এমন সংখ্যাকে অবিশ্বাস্য বলা হচ্ছে। কারণ, বিশ্বের বহু নোবেলজয়ী বিজ্ঞানী কিংবা দীর্ঘদিনের প্রতিষ্ঠিত গবেষকদেরও সাইটেশন সংখ্যা এর কাছাকাছি পৌঁছায় না। ফলে প্রশ্ন উঠেছে—এত বিপুল সাইটেশন কোথা থেকে এলো?
সাইটেশন হলো এমন একটি সূচক, যার মাধ্যমে বোঝা যায় কোনো গবেষকের লেখা বই, গবেষণাপত্র, বুক চ্যাপ্টার বা কনফারেন্স পেপার অন্যরা তাদের লেখায় কতবার রেফারেন্স হিসেবে ব্যবহার করেছেন। অর্থাৎ, গবেষণা সমাজে একজন লেখকের কাজ কতটা প্রভাব ফেলেছে, তার একটি পরিমাপ এটি। Google Scholar-এ এই তথ্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংরক্ষিত থাকে এবং গবেষকদের মান নির্ধারণে প্রায়ই এটি ব্যবহার করা হয়।
তবে গবেষণা বিশ্লেষকদের অভিযোগ, ইয়োসোয়েপ এধি রাচমাদের ক্ষেত্রে এই স্বাভাবিক সাইটেশন প্রবাহের বড় অংশই এসেছে একটি কৌশলী স্ব-উদ্ধৃতি চক্রের মাধ্যমে।
তথ্য ঘেঁটে দেখা যায়, শুধু ২০২৫ সালেই তার সাইটেশন বৃদ্ধি হয়েছে কয়েক লাখ। বিভিন্ন একাডেমিক পর্যবেক্ষণমাধ্যমে প্রকাশিত বিশ্লেষণে দাবি করা হয়েছে, ওই সময় তার প্রোফাইলে ৭ লাখেরও বেশি সাইটেশন যোগ হয় এবং মোট সংখ্যা ৫ মিলিয়ন ছাড়িয়ে যায়।
গবেষণা দুনিয়ায় সেলফ সাইটেশন বা নিজের আগের কাজকে নতুন লেখায় রেফারেন্স দেওয়া অস্বাভাবিক নয়। বরং নির্দিষ্ট সীমায় এটি স্বীকৃত। কিন্তু ইয়োসোয়েপের বিরুদ্ধে অভিযোগ হলো, তিনি এই সুযোগকে এমনভাবে ব্যবহার করেছেন যাতে তার প্রায় সব নতুন প্রকাশনাই পুরোনো নিজের লেখার উদ্ধৃতিতে ভরে গেছে। ফলে প্রতিটি নতুন ডকুমেন্ট তার আগের শত শত লেখাকে আবারও সাইটেশন দিচ্ছে।
সবচেয়ে বিস্ময়কর তথ্য হলো—তার কয়েকটি বহু পুরোনো প্রকাশনায়ও পরবর্তী বছরের লেখা রেফারেন্স হিসেবে যুক্ত থাকার নমুনা পাওয়া গেছে। গবেষণা সংশ্লিষ্টদের ভাষায়, এটি স্বাভাবিক প্রকাশনা ধারার সঙ্গে সাংঘর্ষিক এবং ইঙ্গিত করে যে পরবর্তী সময়ে ডকুমেন্ট সম্পাদনা বা পুনরায় আপলোডের মাধ্যমে উদ্ধৃতি বাড়ানো হয়েছে।
প্রকাশনা পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ১৯৯২ সাল থেকে তার নামে হাজার হাজার ডকুমেন্ট যুক্ত হয়েছে। তবে সেগুলোর বড় অংশই মূলধারার পিয়ার-রিভিউড জার্নালে নয়; বরং বই, বুক চ্যাপ্টার, সম্মেলনপত্র কিংবা স্বপ্রকাশিত একাডেমিক কনটেন্ট। ResearchGate-এ তার প্রোফাইলেও নিজস্ব প্রকাশনা প্ল্যাটফর্ম ও একাধিক স্বনিয়ন্ত্রিত প্রকাশনা উদ্যোগের তথ্য রয়েছে।
একাডেমিক সূচক Web of Science-এ তার মোট রেকর্ডের তুলনায় ইনডেক্সড ও স্বীকৃত গবেষণাপত্রের সংখ্যা অত্যন্ত সীমিত। অর্থাৎ, বিপুল সংখ্যক ডকুমেন্ট থাকলেও আন্তর্জাতিকভাবে মাননিয়ন্ত্রিত জার্নালে তার উপস্থিতি তুলনামূলক কম। Web of Science-এর গবেষক শনাক্তকরণ পদ্ধতিতেও এই পার্থক্য স্পষ্ট।
সহজ ভাষায় বললে, অভিযোগের সারমর্ম দাঁড়ায়—তিনি নিজেই বিপুল পরিমাণ একাডেমিক লেখা তৈরি করেছেন, নিজস্ব বা সংশ্লিষ্ট প্রকাশনা মাধ্যমে সেগুলো প্রকাশ করেছেন এবং সেই লেখাগুলোর ভেতরেই বারবার নিজের অন্যান্য লেখাকে উদ্ধৃত করেছেন। এতে গুগল স্কলারের মতো উন্মুক্ত ইনডেক্সিং সিস্টেমে তার সাইটেশন সংখ্যা অস্বাভাবিকভাবে ফুলে উঠেছে।
আরও তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, ২০২৬ সালে তার নতুন প্রকাশনা কার্যত না থাকায় একই সঙ্গে সাইটেশন বৃদ্ধিও প্রায় থেমে গেছে বলে একাধিক বিশ্লেষণে উঠে এসেছে। অর্থাৎ, নতুন ডকুমেন্ট যোগ না হওয়ায় কৃত্রিম উদ্ধৃতি প্রবাহও বন্ধ হয়েছে—এমন ধারণাই জোরালো হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, Google Scholar বই, রিপোজিটরি, থিসিস, ব্যক্তিগত আপলোড, কনফারেন্স ডকুমেন্টসহ বিস্তৃত উৎস থেকে সাইটেশন সংগ্রহ করে। ফলে নিয়ন্ত্রিত মান যাচাই ছাড়া সেখানে সংখ্যা দ্রুত বাড়ানো সম্ভব। বিপরীতে Scopus বা Web of Science-এর মতো সূচকে কঠোর জার্নাল নির্বাচন ও পিয়ার রিভিউ ফিল্টার থাকায় এমন স্ফীতি তৈরি করা অনেক কঠিন। এ কারণেই এখন এই ঘটনাকে অনেকে গবেষণা-পরিমাপ ব্যবস্থার বড় দুর্বলতার উদাহরণ হিসেবে দেখছেন।
সংখ্যা দেখে মুগ্ধ হওয়ার আগে তাই নতুন করে ভাবতে হচ্ছে—সবচেয়ে বড় সাইটেশনধারী গবেষক মানেই কি সবচেয়ে প্রভাবশালী গবেষক? নাকি ডিজিটাল একাডেমিয়ার অ্যালগরিদমিক ফাঁক গলে তৈরি হতে পারে কৃত্রিম খ্যাতির পাহাড়ও?
