মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের উত্তেজনা নতুন এক বিপজ্জনক মোড়ে পৌঁছেছে। উভয় পক্ষ যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকার দাবি করলেও বাস্তবে উপসাগরীয় অঞ্চলে পাল্টাপাল্টি হামলা, ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ, নৌ-অভিযান এবং সামরিক মোতায়েন পরিস্থিতিকে কার্যত “অঘোষিত যুদ্ধ”-এর দিকে ঠেলে দিচ্ছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালী কেন্দ্রিক উত্তেজনা এখন বৈশ্বিক অর্থনীতি ও জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠেছে।
আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সূত্র অনুযায়ী, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন—মার্কিন নৌবাহিনীর ডেস্ট্রয়ারগুলো ইরানের আক্রমণ “সম্পূর্ণভাবে প্রতিহত” করেছে এবং যুদ্ধবিরতি এখনো বহাল রয়েছে। তবে একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় ইরানের বন্দর আব্বাস ও কেশম বন্দরে বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে বলে জানা যায়। মার্কিন কর্মকর্তারা একে “সীমিত আত্মরক্ষামূলক অভিযান” বললেও তেহরান এটিকে সরাসরি যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন হিসেবে দেখছে।
ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) জানিয়েছে, মার্কিন হামলার জবাবে তারা হরমুজ প্রণালিতে অবস্থানরত মার্কিন যুদ্ধজাহাজের বিরুদ্ধে “তীব্র ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা” চালিয়েছে। মার্কিন সেন্টকমের তথ্য অনুযায়ী, ইউএসএস ট্রাক্সটন, ইউএসএস মেসন এবং ইউএসএস রাফায়েল পেরাল্টাকে লক্ষ্য করে একাধিক হামলা চালানো হলেও সেগুলো প্রতিহত করা হয়েছে। পাল্টা অভিযানে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি, ড্রোন লঞ্চ সাইট ও ছোট নৌযান ধ্বংস করেছে বলে দাবি করা হয়।
এই সংকটের কেন্দ্রে রয়েছে ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’—হরমুজ প্রণালী দিয়ে আটকে পড়া আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচল পুনরায় সচল করার মার্কিন পরিকল্পনা। ওয়াশিংটন দাবি করছে, বিশ্ববাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে এই উদ্যোগ প্রয়োজন। তবে ইরান স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, যুদ্ধ স্থায়ীভাবে শেষ না হওয়া, মার্কিন নৌ অবরোধ প্রত্যাহার এবং নিষেধাজ্ঞা তুলে না নেওয়া পর্যন্ত হরমুজ পুরোপুরি খুলে দেওয়া হবে না।
পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে উপসাগরীয় মিত্র রাষ্ট্রগুলোর ভূমিকা। বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, সৌদি আরব ও কুয়েত যুক্তরাষ্ট্রকে সামরিক ঘাঁটি ও আকাশসীমা ব্যবহারের ক্ষেত্রে শিথিলতা দিয়েছে। একই সঙ্গে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও প্রায় ২৫.৮ বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র বিক্রির অনুমোদন দিয়েছেন বলে জানা যায়, যা উপসাগরীয় সামরিক ভারসাম্যকে আরও উত্তপ্ত করতে পারে।
অন্যদিকে, ইরান অভিযোগ করেছে যে মার্কিন বাহিনী একটি ইরানি তেলবাহী জাহাজেও হামলা চালিয়েছে। যদিও যুক্তরাষ্ট্র আনুষ্ঠানিকভাবে এই অভিযোগ পুরোপুরি স্বীকার করেনি, তবে উপসাগরীয় জলসীমায় ট্যাংকার নিরাপত্তা এখন বড় উদ্বেগ হয়ে উঠেছে। ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজে দীর্ঘমেয়াদি সংঘাত শুরু হলে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ভয়াবহ সংকটে পড়তে পারে এবং দক্ষিণ এশিয়ার আমদানিনির্ভর অর্থনীতিগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—উভয় পক্ষই এখন “পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ নয়, বরং সামরিক চাপ” কৌশল অনুসরণ করছে। যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি যুদ্ধ এড়িয়ে ইরানকে আলোচনায় ফিরিয়ে আনতে চায়, আর ইরান সীমিত প্রতিরোধের মাধ্যমে নিজের কৌশলগত অবস্থান ধরে রাখতে চাইছে। কিন্তু হরমুজের মতো স্পর্শকাতর অঞ্চলে একটি ভুল হিসাব বা অতিরিক্ত সামরিক প্রতিক্রিয়া পুরো মধ্যপ্রাচ্যকে নতুন আঞ্চলিক যুদ্ধে ঠেলে দিতে পারে।
বর্তমানে যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকলেও বাস্তবতা হলো—উপসাগরে শান্তির চেয়ে অনিশ্চয়তাই এখন বেশি দৃশ্যমান।
লেখক: মাসুম খলিলি, সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক।
