মালদ্বীপের প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মাইজ্জু (Mohamed Muizzu) এর ব্যক্তিগত সম্পর্ক নিয়ে প্রকাশিত একটি প্রামাণ্যচিত্রকে কেন্দ্র করে দেশটিতে দুই সাংবাদিককে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ও মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মধ্যে তীব্র উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। তারা এই ঘটনাকে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার ওপর বড় ধরনের আঘাত হিসেবে বর্ণনা করেছে।
আল–জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অনলাইন সংবাদমাধ্যম ‘আদাদু’র দুই সাংবাদিক মোহাম্মদ শাহজাহান ও লিভান আলী নাসিরকে পৃথকভাবে কারাদণ্ড দিয়েছেন মালদ্বীপের একটি ফৌজদারি আদালত। রাজধানী মালেতে গত মঙ্গলবার রুদ্ধদ্বার শুনানির মাধ্যমে শাহজাহানকে ১৫ দিন এবং নাসিরকে ১০ দিনের কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
ঘটনার সূত্রপাত ‘আয়শা’ নামে একটি প্রামাণ্যচিত্র প্রকাশকে কেন্দ্র করে। গত ২৮ মার্চ আদাদুর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্ল্যাটফর্মে প্রকাশিত ওই প্রামাণ্যচিত্রে পরিচয় গোপন রাখা এক নারী দাবি করেন, প্রেসিডেন্ট মুইজ্জুর সঙ্গে তাঁর ব্যক্তিগত সম্পর্ক ছিল। তবে শুরু থেকেই এসব অভিযোগকে ‘ভিত্তিহীন’ ও ‘মিথ্যা’ বলে উড়িয়ে দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট।
এই প্রামাণ্যচিত্র প্রকাশের পর আদালত এর বিষয়ে যেকোনো ধরনের আলোচনা, প্রতিবেদন বা পরোক্ষ মন্তব্যের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে। অভিযোগ রয়েছে, সেই নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘনের কারণেই দুই সাংবাদিককে দণ্ড দেওয়া হয়েছে।
আন্তর্জাতিক সাংবাদিক সংগঠন International Federation of Journalists (ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন অব জার্নালিস্টস–আইএফজে) এ ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। একইভাবে Committee to Protect Journalists (কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টস–সিপিজে) এই সাজাকে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতাকে অপরাধ হিসেবে দেখানোর অপচেষ্টা বলে মন্তব্য করেছে।
এদিকে প্রেসিডেন্টের মুখপাত্র মোহাম্মদ হোসেন শরিফ সরকারের অবস্থান ব্যাখ্যা করে বলেন, এটি গণমাধ্যম দমন নয়; বরং আদালতের স্বাভাবিক বিচারিক প্রক্রিয়া। তাঁর দাবি, এই মামলার সঙ্গে স্বাধীন সাংবাদিকতার কোনো সম্পর্ক নেই।
প্রামাণ্যচিত্র প্রকাশের পর গত এপ্রিলে ‘আদাদু’ কার্যালয়ে অভিযান চালায় পুলিশ। এ সময় সাংবাদিক ও কর্মকর্তাদের ল্যাপটপ, হার্ডড্রাইভ ও বিভিন্ন তথ্যসংরক্ষণ ডিভাইস জব্দ করা হয়। সংবাদমাধ্যমটির অভিযোগ, বিচার প্রক্রিয়া ছিল সম্পূর্ণ গোপনীয় এবং সাংবাদিকদের আত্মপক্ষ সমর্থনের পর্যাপ্ত সুযোগ দেওয়া হয়নি।
এ ঘটনায় মালদ্বীপে গণতন্ত্র ও সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে। সম্প্রতি দেশটিতে একটি নতুন গণমাধ্যম আইন পাস হয়েছে, যার মাধ্যমে সরকার-সমর্থিত একটি কমিশনকে সংবাদমাধ্যম বন্ধ বা জরিমানা করার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। সমালোচকদের মতে, এসব পদক্ষেপ দেশটিতে মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে সংকুচিত করছে।
মালদ্বীপ জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশন এই ঘটনাকে দেশটির গণতান্ত্রিক ইতিহাসে নজিরবিহীন বলে উল্লেখ করেছে। সংগঠনটির দাবি, আদালতের নিষেধাজ্ঞা সাংবিধানিকভাবে যৌক্তিকতা ও প্রয়োজনীয়তার মানদণ্ড পূরণ করতে পারেনি।
মালদ্বীপের সাবেক প্রেসিডেন্ট Ibrahim Mohamed Solih–ও সাংবাদিকদের কারাদণ্ডের সমালোচনা করেছেন। তিনি একে গণমাধ্যমকে ভয় দেখানোর অপচেষ্টা হিসেবে উল্লেখ করেন।
এদিকে ‘আদাদু’র দুই সম্পাদক হোসেন ফিয়াজ মুসা ও হাসান মোহাম্মদের বিরুদ্ধেও মামলা হয়েছে। তাঁদের বিরুদ্ধে ইসলামি আইন অনুযায়ী ‘কজফ’ (ব্যভিচারের মিথ্যা অভিযোগ আনা) ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে তাঁদের কারাদণ্ডের পাশাপাশি বেত্রাঘাতেরও মুখোমুখি হতে হতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক এই ঘটনাগুলো মালদ্বীপে রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এবং গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে।
