পবিত্র ঈদুল আজহা মুসলিম উম্মাহর অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব। এই দিনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত হলো কুরবানি। কুরবানি শুধু পশু জবাইয়ের নাম নয়; বরং এটি মহান আল্লাহর প্রতি আনুগত্য, ত্যাগ ও তাকওয়ার এক অনন্য শিক্ষা।
মহান আল্লাহর আদেশে ইব্রাহীম (আ.) তাঁর প্রিয় পুত্র ইসমাইল (আ.)-কে কুরবানি করার জন্য প্রস্তুত হয়েছিলেন। তাঁদের সেই অনুগত্য ও ত্যাগের স্মৃতিই যুগে যুগে মুসলমানদের জন্য কুরবানির বিধান হিসেবে নির্ধারিত হয়েছে।
কুরবানির গুরুত্ব
পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ বলেন—
“অতএব তুমি তোমার প্রতিপালকের উদ্দেশ্যে সালাত আদায় করো এবং কুরবানি করো।”
— সূরা আল-কাউসার: ২
অন্য আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেন—
“আল্লাহর কাছে পৌঁছায় না এগুলোর গোশত ও রক্ত; বরং পৌঁছায় তোমাদের তাকওয়া।”
— সূরা আল-হাজ্জ: ৩৭
হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন—
“সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও যে ব্যক্তি কুরবানি করল না, সে যেন আমাদের ঈদগাহের নিকটবর্তী না হয়।”
— সুনানে ইবনে মাজাহ
কার ওপর কুরবানি ওয়াজিব
প্রাপ্তবয়স্ক, সুস্থ মস্তিষ্কসম্পন্ন এবং নেসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক মুসলমানের ওপর কুরবানি ওয়াজিব। প্রয়োজনের অতিরিক্ত সম্পদ যদি থাকে, তবে তাকে কুরবানি আদায় করতে হবে।
পুরুষ ও নারী উভয়ের জন্যই এই বিধান প্রযোজ্য।
কোন পশু কুরবানি করা যাবে
ইসলামে নির্ধারিত পশু ছাড়া অন্য কোনো পশু কুরবানি করা বৈধ নয়। কুরবানির জন্য বৈধ পশু হলো—
- উট
- গরু
- মহিষ
- ছাগল
- ভেড়া
পশুর বয়স
- ছাগল ও ভেড়ার বয়স কমপক্ষে এক বছর হতে হবে
- গরু ও মহিষের বয়স কমপক্ষে দুই বছর হতে হবে
- উটের বয়স কমপক্ষে পাঁচ বছর হতে হবে
যেসব ত্রুটিযুক্ত পশু কুরবানি বৈধ নয়
হাদিস অনুযায়ী চার ধরনের পশু দ্বারা কুরবানি শুদ্ধ হয় না—
- স্পষ্ট অন্ধ পশু
- স্পষ্ট রোগাক্রান্ত পশু
- খোঁড়া পশু
- অত্যন্ত দুর্বল ও হাড্ডিসার পশু
— সুনানে আবু দাউদ
এছাড়া কান বা লেজের অধিকাংশ কাটা, দাঁত পড়ে যাওয়া কিংবা এমন দুর্বল পশু যা হাঁটতে পারে না—এসব পশুও কুরবানির জন্য উপযুক্ত নয়।
অংশীদারির বিধান
একটি গরু, মহিষ বা উটে সর্বোচ্চ সাতজন শরিক হতে পারেন। তবে প্রত্যেকের নিয়ত হতে হবে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন।
ছাগল বা ভেড়ায় একজনের বেশি শরিক হওয়া যায় না।
কুরবানির সময়
ঈদের নামাজের পর থেকে জিলহজের ১২ তারিখ সূর্যাস্ত পর্যন্ত কুরবানি করা যায়।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
“যে ব্যক্তি ঈদের নামাজের আগে জবাই করল, তা সাধারণ গোশত হিসেবে গণ্য হবে; কুরবানি হবে না।”
— সহিহ বুখারি
জবাইয়ের সুন্নত পদ্ধতি
পশু জবাইয়ের সময় কিবলামুখী করে শোয়ানো উত্তম। ধারালো ছুরি ব্যবহার করতে হবে এবং পশুকে কষ্ট দেওয়া যাবে না।
জবাইয়ের সময় বলতে হবে—
“বিসমিল্লাহি আল্লাহু আকবার”
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
“তোমরা সুন্দরভাবে জবাই করো এবং ছুরি ধারালো করো, যাতে পশুর কষ্ট কম হয়।”
— সহিহ মুসলিম
কুরবানির গোশত বণ্টন
কুরবানির গোশত তিন ভাগ করা উত্তম—
- এক ভাগ নিজের পরিবারের জন্য
- এক ভাগ আত্মীয়স্বজন ও প্রতিবেশীর জন্য
- এক ভাগ দরিদ্র মানুষের জন্য
তবে সব গোশত গরিবদের মধ্যে বিতরণ করলেও তা বৈধ।
কুরবানির প্রকৃত শিক্ষা
কুরবানির মূল শিক্ষা হলো আত্মত্যাগ, আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আনুগত্য এবং হৃদয়ের তাকওয়া অর্জন। শুধু পশু জবাই নয়, বরং নিজের অহংকার, লোভ ও গুনাহ থেকে দূরে থাকার শিক্ষাও দেয় কুরবানি।
ধর্মীয় আলেমরা বলেন, কুরবানির মাধ্যমে একজন মুসলমান মহান আল্লাহর সন্তুষ্টিকে নিজের সবকিছুর ঊর্ধ্বে স্থান দেওয়ার অঙ্গীকার করেন।
