সোমবার, ০১ জুন ২০২৬
Logo
×
তৎকালীন পাকিস্তান আমলে ইসলামি শিক্ষা বিতর্ক ও আব্দুল মালেক হত্যার রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট তুলে ধরেছেন লেখক

আব্দুল মালেককে কেন হত্যা করা হয়?

লেখক: মীর সালমান সামিল ০২ জুন ২০২৬, ০৩:০২ পূর্বাহ্ন

আব্দুল মালেক ইসলামপন্থী ছিল এজন্য নাস্তিক্যবাদি ছাত্রলিগ-ছাত্র ইউনিয়ন আব্দুল মালেককে শহীদ করেছে, ঘটনা এতটা সিম্পল না।

১৯৬৯ সালে এয়ার মার্শাল নূর খানের নেতৃত্বে পাকিস্তান সরকার ‘নূর খান শিক্ষা কমিশন’ গঠন করেন।

কমিশনের মূল লক্ষ্য ছিল পাকিস্তানের প্রচলিত ত্রুটিপূর্ণ শিক্ষাব্যবস্থা সংস্কার করে জাতীয় সংহতি রক্ষা করা, বেকারত্ব কমানো এবং শিক্ষার মানোন্নয়ন করা। ‘নূর খান শিক্ষা কমিশন’ যে সুপারিশ প্রদান করে:

▪️উদ্দেশ্য

১। শিক্ষা ব্যবস্থার মূল লক্ষ্য হবে ব্রিটিশ কলোনিয়াল ব্যবস্থা থেকে সরে এসে দেশীয় মূল্যবোধ, ইসলামি ভাবধারায় সাংস্কৃতিক ও আদর্শিক ভিত্তি গড়ে তোলা। [Shifting away from the British colonial framework to create a system that reflected Pakistani identity, common set of cultural values, and religious heritage.]

২। মাদরাসা শিক্ষা এবং সাধারণ পাবলিক শিক্ষা ব্যবস্থাকে একীভূত বা সমন্বিত করার প্রয়াস নেওয়া হয়।

৩। মাধ্যমিক স্তরের দশম শ্রেণি পর্যন্ত ‘ইসলামিয়াত’ বিষয়টিকে বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব করা হয় এবং উচ্চশিক্ষা ও বিজ্ঞান শিক্ষাতেও ইসলামি দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলনের কথা বলা হয়।

▪️মাতৃভাষার মাধ্যমে শিক্ষা দান

১৯৭৪ সালের মধ্যে পূর্ব পাকিস্তানে বাংলা এবং পশ্চিম পাকিস্তানে উর্দুকে শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে চালুর সুপারিশ করা হয়।

▪️গণশিক্ষা ও বয়স্ক শিক্ষা

১। নিরক্ষরতা দূরীকরণের জন্য একটি ক্র্যাশ প্রোগ্রাম গঠন করতে হবে।

২। ১৯৮০ সালের মধ্যে প্রায় ৬৮ মিলিয়ন প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিককে অক্ষর জ্ঞান সম্পন্ন করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়।

৩। এই লক্ষ্য অর্জনে ‘ন্যাশনাল লিটারেসি কোর’ গঠনের প্রস্তাব দেওয়া হয়।

▪️বৃত্তিমূলক ও কারিগরি শিক্ষা

১। মাধ্যমিক স্তরে সাধারণ শিক্ষার পাশাপাশি ব্যাপকভাবে কারিগরি শিক্ষার উপর জোর দেওয়া হয়। যাতে শিক্ষা শেষে যুবসমাজ সরাসরি কর্মসংস্থানে প্রবেশ করতে পারে।

▪️শিক্ষা প্রশাসনের বিকেন্দ্রীকরণ

১। শিক্ষকদের সুযোগ-সুবিধা ও বেতনের মান বৃদ্ধির সুপারিশ করা হয়।

২। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর তদারকি ও সমন্বয়ের জন্য ‘বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন’ (UGC) গঠনের প্রস্তাব করা হয়।

▪️▪️
পাকিস্তানের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে এই শিক্ষানীতি নিয়ে আলাপ-আলোচনা হয়। সবাই এই শিক্ষানীতিকে স্বাগত জানায়। কিন্তু ছাত্র ইউনিয়ন এবং ছাত্রলীগ বেঁকে বসে।

১৯৬৯ সালের ২ আগস্ট ঢাবিতে আলোচনা সভা হয়, সেখান ইউনিয়ন লীগের বক্তারা দাবি করে শিক্ষা হতে হবে সেকুলার ব্যবস্থায়। পাকিস্তান আমাদের উপর তাদের ভ্যালুজ চাপিয়ে দিতে চায়।

ছাত্র সংঘের ঢাবি সভাপতি আব্দুল মালেক তার বক্তব্যে বলেন—

একটি দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা কোনো আদর্শিক শূন্যতার ওপর দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না। পাকিস্তানের শিক্ষা ব্যবস্থার মূল ভিত্তি হওয়া উচিত ইসলামের আদর্শিক চেতনা।

দেশে প্রচলিত ব্রিটিশ সেক্যুলার ‘মেকলে শিক্ষা পদ্ধতি’ কিছু ব্রাউন ইংলিশ ম্যান তৈরি করেছে যারা এদেশের সাধারণ মানুষের সংস্কৃতি ও ধর্মীয় মূল্যবোধ থেকে বিচ্ছিন্ন। তারাই ধর্মহীন শিক্ষার কথা বলছে।

তিনি উল্লেখ করেন ইউনিয়ন-লীগ কমন ভ্যালুজের ব্যাপারটাই বোঝে নাই, Common values এবং One set of values এর মধ্যে পার্থক্য আছে। সমাজতান্ত্রিক রাশিয়ার মতো জোরপূর্বক কোনো একক সংস্কৃতি চাপিয়ে না দিয়ে, স্থানীয় সংস্কৃতির বিকাশ ঘটিয়ে একটি অভিন্ন নৈতিক ও আদর্শিক কাঠামোর অধীনে শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।

তিনি আরো বলেন ইউনিয়ন লীগ শিক্ষার দর্শন কি সেটাই বুঝতে পারে নাই। মহাকবি জন মিল্টন শিক্ষার সজ্ঞা দিয়ে বলেছিলেন- শিক্ষা হল দেহ, মন, এবং আত্না পরিশুদ্ধ করার প্রক্রিয়া। আব্দুল মালেক বলেন, আর কোনো সুনির্দিষ্ট আদর্শ ছাড়া মানুষের এই আত্মিক ও মানসিক বিকাশ অসম্ভব।

তিনি যোগ করেন প্রচলিত ব্রিটিশ সেক্যুলার শিক্ষা ব্যবস্থা চরিত্রগত ভাবে ইসলাম বিদ্বেষী। এটা খোদ ইংরেজরাই স্বীকার করেছে। উইলিয়াম হান্টার বলেছিল,
“The truth is that our system of public instruction is opposed to the tradition, unsuited to the requirements, and hateful to the religion of the Musalmans.”

তিনি আরও বলেন ইসলামি শিক্ষার দাবি নতুন না। ১৯৩৮ সালে শেরে বাংলা একে ফজলুল হক পাটনা সম্মেলনে বলেছিলেন, আমরা পাকিস্তানের বুকে ইসলামি শিক্ষা ব্যবস্থা প্রবর্তন করতে চাই।

▪️
আব্দুল মালেকের বক্তব্যের পরে ইউনিয়ন-লীগ ব্যাং ব্যাং বুস। ঢাবির সমর্থন চলে যায় ইসলামি শিক্ষা ব্যবস্থার প্রতি।

এই ড্যামেজ কন্ট্রোল করার জন্য ইউনিয়ন-লীগ ১২ তারিখ আবার একটা বিতর্ক সভা ডাকে। কিন্তু ছাত্র সংঘকে আমন্ত্রণ জানানো হয় না। আব্দুল মালেক সেখানে উপস্থিত হয়ে তার মত জানানোর দাবি করেন।

ছাত্রদদের চাপে আব্দুল মালেককে ৫ মিনিট বক্তব্য দেবার সুযোগ দেওয়া হয়। এবং আব্দুল মালেকের ৫ মিনিটের বক্তব্যে পুরা সভার সমর্থন ঘুরে যায়।

পরপর দুইটা অপমানজনক পরাজয় ইউনিয়ন-লীগ সহ্য করতে পারে না। তারা বুঝতে পারে মালেক থাকলে ঢাবিতে তাদের জমিদারি হাত ছাড়া হয়ে যাবে।

বক্তব্যের শেষে ছাত্রাবাসে ফেরার পথে রেসকোর্স ময়দানে তোফায়েল আহমেদ ও হাসানুল হক ইনুর নেতৃত্বে একদল গুন্ডা আব্দুল মালেককে আক্রমন করে শহীদ করে।

ঢাবির ইতিহাসে ৩ জন শহীদ গুরুত্বপূর্ণ হলেন:

১। শহীদ নজির আহমদ
২। শহীদ আব্দুল মালেক
৩। শহীদ শরীফ ওসমান হাদি

এই তিন জনকেই শহীদ করা হয়েছে মূলত দুইটা কারনে:

১। জনপ্রিয়তা।
২। তারা ভারতের সাংস্কৃতিক আধিপত্যের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছিল।

তথ্যসূত্র:

১। https://www.dawn.com/news/1492054

২। https://en.banglapedia.org/index.php?title=Education_Commission&utm_source=chatgpt.com

৩। https://www.youtube.com/watch?v=gb72-5bpOr0

লেখক: মীর সালমান সামিল, পিএইচডি গবেষক, জর্জিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, যুক্তরাষ্ট্র।

শেয়ার করুন:
লিঙ্ক কপি হয়েছে
Loading
আরও নিউজ লোড হচ্ছে...