রোববার, ২৪ মে ২০২৬
Logo
×

চিকিৎসাসেবায় বাড়তি বাণিজ্যিক চাপ, ‘পরামর্শ ফি’ ঘিরে বাড়ছে জনঅসন্তোষ

প্রথম সমাচার ডেস্ক ০২ মে ২০২৬, ১০:১৮ অপরাহ্ন

দেশের বেসরকারি চিকিৎসাসেবায় ‘পরামর্শ ফি’ বা চিকিৎসকের ভিজিট ফি নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্রমেই অসন্তোষ বাড়ছে। বিশেষ করে নতুন রোগী ও পুরাতন রোগীর জন্য আলাদা আলাদা ফি নির্ধারণের প্রবণতা জনমনে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে—চিকিৎসা কি ধীরে ধীরে মানবিক সেবা থেকে পুরোপুরি বাণিজ্যিক ব্যবস্থায় রূপ নিচ্ছে?

বিভিন্ন ক্লিনিক ও ব্যক্তিগত চেম্বারে দেখা যাচ্ছে, প্রথমবার চিকিৎসা নিতে গেলে একজন রোগীকে ৭০০ টাকা বা তারও বেশি পরামর্শ ফি দিতে হচ্ছে। অথচ একই চিকিৎসকের কাছে পুনরায় গেলে পুরাতন রোগীর জন্য ফি কিছুটা কমিয়ে ৫০০ টাকা রাখা হচ্ছে। চিকিৎসকদের যুক্তি থাকতে পারে, নতুন রোগীর ইতিহাস শুনতে, পরীক্ষা-নিরীক্ষা দেখতে ও রোগ নির্ণয়ে সময় বেশি লাগে। কিন্তু সাধারণ মানুষের প্রশ্ন হলো—একজন অসুস্থ মানুষের কষ্ট কি ফি-র পার্থক্য বুঝে আসে? চিকিৎসার দরজায় পৌঁছানোর আগেই যদি অর্থনৈতিক চাপ সামনে দাঁড়ায়, তাহলে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের জন্য স্বাস্থ্যসেবা কতটা সহজলভ্য থাকছে?

বাস্তবতা হলো, বর্তমানে চিকিৎসা নিতে গিয়ে ওষুধ, পরীক্ষা, যাতায়াত, হাসপাতাল ব্যয়—সব মিলিয়ে একজন রোগী এমনিতেই চাপে থাকেন। তার সঙ্গে উচ্চ পরামর্শ ফি অনেক পরিবারকে চিকিৎসা নেওয়ার আগেই দুশ্চিন্তায় ফেলে দেয়। অনেকেই প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের কাছে যেতে দেরি করেন শুধু অতিরিক্ত ব্যয়ের ভয়ে। ফলে রোগ জটিল আকার ধারণ করে।

স্বাস্থ্যখাত বিশ্লেষকরা বলছেন, চিকিৎসকদের পেশাগত ব্যয়, চেম্বার পরিচালনা, সহকারী, যন্ত্রপাতি ও সময়ের মূল্য অবশ্যই আছে। কিন্তু চিকিৎসা অন্য দশটি পেশার মতো নয়—এটি সরাসরি মানুষের জীবন, ভয়, কষ্ট ও অসহায়ত্বের সঙ্গে জড়িত। ফলে এখানে অর্থনৈতিক হিসাবের পাশাপাশি নৈতিক দায়বদ্ধতাও বড় বিষয়। রোগী যেন নিজেকে ‘কাস্টমার’ মনে না করে, বরং একজন সহমর্মিতা পাওয়ার অধিকারী মানুষ মনে করতে পারেন—সেই পরিবেশ তৈরি করাই জরুরি।

সচেতন মহল মনে করছে, স্বাস্থ্যসেবায় নিয়ন্ত্রণহীন বাণিজ্যিকতা বাড়তে থাকলে ধনী-গরিবের চিকিৎসা বিভাজন আরও তীব্র হবে। একদিকে আর্থিকভাবে সক্ষম মানুষ দ্রুত বিশেষজ্ঞের সেবা পাবেন, অন্যদিকে সীমিত আয়ের মানুষ চিকিৎসা পিছিয়ে দেবেন অথবা নিম্নমানের বিকল্পে যেতে বাধ্য হবেন। এটি দীর্ঘমেয়াদে জনস্বাস্থ্যের জন্য বিপজ্জনক।

অনেকের মতে, ‘পরামর্শ ফি’ নির্ধারণে একটি যৌক্তিক নীতিমালা থাকা প্রয়োজন। কোথাও যেন অস্বাভাবিক ভিজিট ফি, অযৌক্তিক পুনরায় ফি বা রোগীর ওপর বাড়তি আর্থিক চাপ তৈরি না হয়, তা দেখার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের। একই সঙ্গে চিকিৎসকদের মধ্যেও রোগীকেন্দ্রিক মানসিকতা আরও জোরদার হওয়া দরকার।

চিকিৎসা শুধু প্রেসক্রিপশন লেখা নয়; এটি একজন অসুস্থ মানুষকে ভরসা দেওয়া, তার আতঙ্ক কমানো এবং সুস্থতার পথ দেখানো। তাই চিকিৎসাসেবার দরজায় যদি প্রথমেই বাণিজ্যিকতার কড়া হিসাব দাঁড়িয়ে যায়, তবে মানবিক স্বাস্থ্যব্যবস্থার ধারণাই প্রশ্নের মুখে পড়ে। এখনই সময়—স্বাস্থ্যখাতকে আরও সহনশীল, ন্যায্য ও মানুষের নাগালের মধ্যে রাখার বিষয়ে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার।

শেয়ার করুন:
লিঙ্ক কপি হয়েছে
Loading
আরও নিউজ লোড হচ্ছে...