লক্ষ্মীপুরের রামগতি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসাসেবার নাজুক চিত্র তুলে ধরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি অভিজ্ঞতা শেয়ার করেছেন চিকিৎসক ডা. আব্দুল্লাহ আল মারযূক। তার বর্ণনায় উঠে এসেছে—সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসক থাকলেও প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি, জীবাণুনাশক সামগ্রী, পরিচ্ছন্নতা কর্মী ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা না থাকায় সেবা দিতে গিয়ে প্রতিনিয়ত সীমাহীন সংকটে পড়তে হচ্ছে।
ডা. আব্দুল্লাহ আল মারযূক জানান, সম্প্রতি এক নারী রোগী কানে ভীমরুল ঢুকে যাওয়ার জটিল সমস্যা নিয়ে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে আসেন। কিন্তু নাক-কান-গলার রোগী দেখার জন্য হাসপাতালে প্রয়োজনীয় কোনো সরকারি যন্ত্রপাতি না থাকায় তাৎক্ষণিকভাবে চিকিৎসা দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। পরে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তার অনুরোধে তিনি নিজের ব্যক্তিগত চেম্বার থেকে প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম এনে চিকিৎসা কার্যক্রম শুরু করেন।

তিনি বলেন, ব্যক্তিগত মালিকানাধীন দামি চিকিৎসা যন্ত্র হাসপাতালে সংরক্ষণ করাও ঝুঁকিপূর্ণ, কারণ সেখানে কোনো নিরাপত্তারক্ষী নেই। তবুও রোগীর জরুরি অবস্থা বিবেচনায় নিজ দায়িত্বে যন্ত্র এনে দুই কান থেকে দুটি ভীমরুল বের করতে সক্ষম হন। প্রাথমিকভাবে রোগীকে স্টেরয়েড দেওয়া হয় এবং পরবর্তী জটিলতা এড়াতে প্রয়োজনীয় পর্যবেক্ষণের পরামর্শ দেওয়া হয়।
চিকিৎসকের ভাষ্য অনুযায়ী, শুধু বিশেষায়িত যন্ত্র নয়—এমনকি ব্যক্তিগত ব্যবহারের টাং ডিপ্রেসর বা অন্যান্য সরঞ্জাম জীবাণুমুক্ত করার জন্য স্যাভলন, হেক্সিসল, টিস্যুর মতো সাধারণ সামগ্রীও অনেক সময় নিজের পকেটের টাকায় কিনতে হয়। সরকারি সরবরাহ হিসেবে সামান্য গজ পাওয়া গেলেও পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসাসেবা দিতে যে ন্যূনতম উপকরণ দরকার, তার ঘাটতি প্রকট।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, সাধারণ মানুষ হাসপাতালে গেলে প্রথমেই ডাক্তার খোঁজেন এবং সেবা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন, কিন্তু চিকিৎসকের কাজ করার জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও সরঞ্জাম আছে কি না, সে বিষয়টি সচরাচর আলোচনায় আসে না। একইভাবে হাসপাতালের পরিচ্ছন্নতা নিয়ে অভিযোগ থাকলেও বাস্তবতা হলো—রামগতি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সরকারিভাবে নিয়োগপ্রাপ্ত কোনো পরিচ্ছন্নতাকর্মী নেই। বেসরকারিভাবে মাত্র একজন কর্মী দিয়ে পুরো হাসপাতালের পরিচ্ছন্নতা কোনোমতে সামাল দেওয়া হচ্ছে।
ডা. আব্দুল্লাহ আল মারযূকের এই অভিজ্ঞতা প্রকাশের পর সামাজিক মাধ্যমে স্বাস্থ্যখাতের তৃণমূল বাস্তবতা নিয়ে নতুন আলোচনা শুরু হয়েছে। অনেকেই বলছেন, উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলোতে শুধু চিকিৎসক নিয়োগ দিলেই সেবার মান নিশ্চিত হয় না; এর সঙ্গে সমন্বিতভাবে প্রয়োজন যন্ত্রপাতি, ওষুধ, স্যানিটেশন, জনবল এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থা।
স্বাস্থ্যসেবা সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, চিকিৎসকদের দায়বদ্ধতার পাশাপাশি অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতাগুলোও সামনে আনা জরুরি। কারণ একজন চিকিৎসক যত দক্ষই হোন না কেন, প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ছাড়া মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। রামগতি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের এই ঘটনা সেই পুরোনো বাস্তবতাকেই আবারও সামনে নিয়ে এলো।
