যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক আরও কঠোর সুদনীতি গ্রহণ করতে পারে—এমন প্রত্যাশা থেকে মার্কিন ডলারের মান চাঙা হয়ে ওঠায় বিশ্ব বাজারে স্বর্ণের দরে নিম্নগতি অব্যাহত রয়েছে। চলতি সপ্তাহ নিয়ে এটি হবে পরপর চতুর্থ সপ্তাহ, যেখানে মূল্যবান এই ধাতুর দাম কমার দিকেই হাঁটছে।
শুক্রবার লেনদেনে স্পট মার্কেটে প্রতি আউন্স স্বর্ণের দাম নেমে এসেছে চার হাজার বিশ ডলারের সামান্য ওপরে, আর ফিউচার মার্কেটে দাম স্থির হয়েছে চার হাজার সাইত্রিশ ডলারের কাছাকাছি। হিসাব করলে দেখা যায়, চলতি সপ্তাহেই প্রায় তিন শতাংশ এবং পুরো মাসে প্রায় এগারো শতাংশ মূল্য খুইয়েছে স্বর্ণ।
মুদ্রাবাজার বিশ্লেষণ সংস্থা ওএএনডিএ-র একজন জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক মন্তব্য করেছেন, ফেডের নীতি নিয়ে বাজারের ধারণা যেভাবে দ্রুত পাল্টে গেছে, তাতেই ডলারে তৈরি হয়েছে এক ধরনের তীব্র গতি, এবং এই গতির চাপেই স্বর্ণের দরে এত বড় পতন ঘটেছে।
ডলার সূচক এখন গত প্রায় এক বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ের কাছাকাছি অবস্থান করছে এবং পরপর দুই সপ্তাহ ধরে এর মান বেড়েই চলেছে। স্বাভাবিকভাবেই, ডলার চাঙা থাকলে অন্য মুদ্রায় লেনদেন করা ক্রেতাদের জন্য স্বর্ণ কেনার খরচ বেড়ে যায়, যা চাহিদায় টান ধরায়।
বাজার সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এ বছরের শুরুতে জানুয়ারির শেষ দিকে স্বর্ণের দাম যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে উঠেছিল, তার পর থেকে যে মূল্য সংশোধন চলছে, তা সামনের দিনগুলোতে আরও গভীর হতে পারে। হিসাব বলছে, ওই রেকর্ড উচ্চতা থেকে এখন পর্যন্ত স্বর্ণের দাম প্রায় ঊনত্রিশ শতাংশ কমে গেছে।
এর পেছনে বড় কারণ যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাতকে ঘিরে তৈরি হওয়া মূল্যস্ফীতির চাপ, যা সুদের হার বৃদ্ধির জল্পনাকে আরও উসকে দিয়েছে। বৃহস্পতিবার প্রকাশিত পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, মে মাসে যুক্তরাষ্ট্রের মূল্যস্ফীতির হার তিন বছরের মধ্যে প্রথমবারের মতো চার শতাংশের সীমা ছাড়িয়ে গেছে, যা মূলত অর্থনীতিবিদদের পূর্বানুমানের সঙ্গেই মিলে গেছে।
ফেডের পছন্দের মূল্যস্ফীতি পরিমাপক হিসেবে পরিচিত পার্সোনাল কনজাম্পশন এক্সপেন্ডিচার সূচকও মে মাসে বার্ষিক হিসাবে চার দশমিক এক শতাংশে গিয়ে ঠেকেছে, যা সাম্প্রতিক তিন বছরের সর্বোচ্চ। এই তথ্য সামনে আসার পর বাজারে এক ধরনের ধারণা তৈরি হয়েছে যে মূল্যস্ফীতি বোধহয় শীর্ষবিন্দু স্পর্শ করে ফেলেছে, কিন্তু তা সত্ত্বেও কেন্দ্রীয় ব্যাংক আরও কঠোর পথে হাঁটবে—এই আশঙ্কাই ডলারকে চাঙা রাখছে।
এর মধ্যে হরমুজ প্রণালীর আশপাশে একটি জাহাজে হামলার খবরে সাময়িকভাবে ভূরাজনৈতিক উদ্বেগ মাথা তুলেছিল, যা স্বর্ণের প্রতি নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে আগ্রহ কিছুটা বাড়িয়ে দিয়েছিল। তবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি প্রাথমিক শান্তি চুক্তি বহাল থাকায় এই উদ্বেগ দ্রুত স্তিমিত হয়ে যায়, এবং তা ডলারের জোরালো প্রবণতা ও সুদ বৃদ্ধির প্রত্যাশার বিপরীতে দাঁড়াতে পারেনি।
স্বর্ণের পথ অনুসরণ করেই অন্য ধাতুগুলোর বাজারেও নিম্নমুখী প্রবণতা দেখা গেছে। রুপার দাম কমে নেমে এসেছে আউন্সপ্রতি সাতান্ন ডলারের কাছে, এবং সাপ্তাহিক হিসাবে এর দরপতনের পরিমাণ প্রায় বারো শতাংশ ছুঁতে পারে। প্ল্যাটিনামের দামও কিছুটা কমেছে, যা পরপর সাত সপ্তাহ ধরে দরপতনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। শিল্পক্ষেত্রে ব্যবহৃত তামার দরেও পতন লক্ষ্য করা গেছে লন্ডন মেটাল এক্সচেঞ্জে।
সার্বিকভাবে বিশ্লেষকদের পর্যবেক্ষণ হলো, চাঙা ডলার, সুদের হার বৃদ্ধির ধারাবাহিকতা এবং ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তা—এই তিন বিষয়ের সম্মিলিত প্রভাবে ধাতুর বাজারে চাপ ক্রমশ বাড়ছে। আসছে গ্রীষ্মের মাসগুলোতে এই প্রবণতা কতদিন টিকে থাকে, তা নিয়েই এখন বাজার পর্যবেক্ষকদের নজর। —রয়টার্স
