দেশের আদালতগুলোতে দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা মামলার চাপ কমাতে আইনগত সহায়তা কার্যক্রমকে আরও ফলপ্রসূ ও জনমুখী করার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান। তিনি বলেছেন, ন্যায়বিচার কোনো বিশেষ শ্রেণির মানুষের জন্য নয়; এটি প্রতিটি নাগরিকের মৌলিক অধিকার। আর এই অধিকার বাস্তবায়নে লিগ্যাল এইড সেবাকে আরও কার্যকরভাবে দেশের তৃণমূল পর্যায়ে পৌঁছে দিতে হবে।
মঙ্গলবার বিকেলে সুপ্রিম কোর্ট অডিটোরিয়ামে জাতীয় আইনগত সহায়তা দিবস-২০২৬ উপলক্ষে আয়োজিত আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। সুপ্রিম কোর্ট লিগ্যাল এইড কমিটির উদ্যোগে আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে বিচার বিভাগ, আইনজীবী সমাজ এবং সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
আইনমন্ত্রী বলেন, দেশের বিপুলসংখ্যক মানুষ আর্থিক অক্ষমতা, আইনি জটিলতা কিংবা প্রক্রিয়াগত অজ্ঞতার কারণে আদালতে নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে পারেন না। ফলে অনেকেই ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হন। লিগ্যাল এইডের মূল উদ্দেশ্যই হচ্ছে সেই অসহায়, দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে রাষ্ট্রীয় সহায়তায় আইনি সেবা পৌঁছে দেওয়া। তিনি মনে করেন, এই ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করা গেলে একদিকে সাধারণ মানুষ দ্রুত আইনি সহায়তা পাবেন, অন্যদিকে অপ্রয়োজনীয় মামলা ও দীর্ঘসূত্রতাও কমে আসবে।
তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, বাংলাদেশে আইনগত সহায়তার প্রাতিষ্ঠানিক ধারণা নব্বইয়ের দশকে শুরু হয় এবং সময়ের সঙ্গে এর পরিধি বেড়েছে। এখন প্রয়োজন এই সেবাকে কেবল কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ না রেখে বাস্তবে আরও সহজলভ্য করা। ইউনিয়ন, উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে আইনি সহায়তা কেন্দ্রগুলোকে সক্রিয় করার পাশাপাশি মানুষকে এ বিষয়ে সচেতন করাও জরুরি বলে মত দেন তিনি।
বিচার বিভাগের অবকাঠামোগত সক্ষমতার প্রসঙ্গ তুলে আইনমন্ত্রী বলেন, বর্তমান মামলাজট নিরসনে শুধু বিচারক বাড়ালেই হবে না; প্রয়োজন সমন্বিত আইনি সহায়তা, মধ্যস্থতা, বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি এবং দরিদ্রবান্ধব আইনি সেবা। এজন্য বিচার বিভাগে বাজেট বরাদ্দ বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার কথাও তিনি উল্লেখ করেন। তার ভাষায়, বিদ্যমান বরাদ্দ দিয়ে সব চাহিদা পূরণ করা সম্ভব নয়, তাই লিগ্যাল এইডকে গতিশীল করতে বাড়তি অর্থায়নের দিকেও সরকার গুরুত্ব দিচ্ছে।
অনুষ্ঠানে সভাপতির বক্তব্যে সুপ্রিম কোর্ট লিগ্যাল এইড কমিটির চেয়ারম্যান বিচারপতি কাজী জিনাত হক বলেন, ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে শুধু আদালতের রায়ই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন সঠিক সময়ে সঠিক আইনি সহায়তা। এ জন্য বিচারপ্রার্থী মানুষের কাছে সহজ ভাষায় আইন পৌঁছে দেওয়া এবং লিগ্যাল এইডের প্রতি আস্থা তৈরি করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
আলোচনা সভায় আপিল বিভাগের বিচারপতি, অ্যাটর্নি জেনারেল, সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশনের নেতৃবৃন্দ, আইনগত সহায়তা অধিদপ্তরের কর্মকর্তাসহ বিচার বিভাগের বিভিন্ন স্তরের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। বক্তারা বলেন, মামলার জট কমাতে আদালতকেন্দ্রিক প্রচলিত ব্যবস্থার পাশাপাশি বিকল্প আইনি সহায়তা কাঠামোকে আরও শক্তিশালী করার এখনই উপযুক্ত সময়।
সংশ্লিষ্টদের মতে, দেশে বিচারপ্রার্থীর সংখ্যা যেমন বাড়ছে, তেমনি বাড়ছে মামলা নিষ্পত্তির সময়ও। এই বাস্তবতায় লিগ্যাল এইড যদি সত্যিকার অর্থে মানুষের আস্থার জায়গা হয়ে উঠতে পারে, তবে তা শুধু দরিদ্র মানুষের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করবে না, বরং সামগ্রিক বিচারব্যবস্থার ওপর চাপও অনেকাংশে কমিয়ে আনবে।
